জীবন নাটকের চেয়ে বেশি নাটকীয়।
চির উন্নত মম শির,
জীবন যুদ্ধে আমি এক অকুতভয় বীর ….
আমি ১৯৯৫ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ড থেকে সেই সময়ের স্টার মার্কস সহ ফাস্ট ডিভিশনে এসএসসি বা মেট্রিক পাশ করি। ১৯৯৭ সালেও আমি যশোর শিক্ষা বোর্ড থেকে কৃতিত্বের সাথে ফার্স্ট ডিভিশনে এইচএসসি পাস করি। ১৯৯৮ সালে আমি খুলনার বি, এল কলেজে ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হবার সুযোগ পাই।
পরিবারের মারাত্মক আর্থিক দুরবস্থার কারণে আমার অনার্সের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। আমি ২০০০ সালের শেষের দিকে ঢাকায় চলে যাই চাকরির সন্ধানে। কোন প্রকার চাকরির ব্যবস্থা করতে না পেরে, আমি আবার ২০০১ সালের মাঝামাঝিতে আমার জন্মস্থান খুলনায় ফেরত চলে আসি। খুলনা এসে সংসারের পুরো দায়িত্ব আমার কাঁধে তুলে নেই। একটা ছোট মুদি দোকান শুরু করি। কিন্তু পুজি সঙ্কটে সেটাও বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়। তখন আমাদের আর্থিক দুরবস্থা চরম পর্যায়ে। মাসে একদিন মাংস কিনে খেতে পারতাম না। এমনকি মাছও না। থাকার জায়গাটারও সেই রকম করুন অবস্থা। আকাশে মেঘ দেখলে ভয় লাগতো; কারণ, ঘরের চাল দিয়ে প্রচুর পানি পড়তো। এই অবস্থায় এক প্রকার প্রাণ বাঁচানোর জন্য অল্প কিছু টাকা যৌতুক নিয়ে বাড়ির নিকটে একটা মেয়েকে ২০০৩ সালে বিবাহ করি। বিবাহের পর আল্লাহর ইচ্ছায় আমার জীবনের নাটকীয় পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
বিবাহের পর আমার বাড়ির নিকটবর্তী একটা কোচিং সেন্টারের অষ্টম শ্রেণীর ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাই। ততদিনে আমি প্রাইভেটে ডিগ্রী (বি, এ) পাস করে বিএডও কমপ্লিট করে ফেলেছি। সেই কোচিং সেন্টারে শিক্ষক হিসেবে সুনাম অর্জন করায় আমাকে প্রমোশন দিয়ে এসএসসি লেভেলের ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পর্যায়ে আমি আমার জীবনে সর্বপ্রথম অর্থ উপার্জনের স্বাদ পাই।
কোচিং ও প্রাইভেট ব্যাচ মিলে একটা ভালো অর্থ তখন আমার উপার্জন হচ্ছিল। বাড়ির অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন করে ফেলি। উঠান, বারান্দা পাকা করে ফেলি। পাকা বাথরুম তৈরি করি। সেই সময় আমি প্রচুর পরিশ্রম করছিলাম এবং অর্থ আয় করছিলাম। আমার এক বন্ধু আমার মেধা আর পরিশ্রমের কথা বিবেচনা করে আমাকে রাজধানী ঢাকায় গিয়ে অধিক অর্থ উপার্জনের পরামর্শ দেয়। তার পরামর্শ অনুযায়ী আমি রাজধানী ঢাকার ডেমরা এলাকায় চলে যাই। এবং সেখানে একটা স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে চাকরি শুরু করি। আল্লাহর রহমতে এই পর্যায়ে আমার জীবনের সর্বোচ্চ উপার্জন আসতে শুরু করে। আমি ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে আমার স্কুলে এবং স্কুলের আশপাশ এলাকায় ব্যাপক সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হই। সেই সময় আমি জীবনে প্রথম বিলাসবহুল দ্রব্য ব্যবহার করার সুযোগ পাই।
যাই হোক, আমার এই সুখ আর সমৃদ্ধি আমার অথবা আমার শ্বশুর বাড়ির কিছু নিকট আত্মীয়ের সহ্য হচ্ছিল না। মূলত তাদের কুপরামর্শে এবং আমার পিতা-মাতা অতি বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হওয়ায় এবং তাদের দেখাশোনা করার কেউ না থাকায়, আমি আবার খুলনায় ফেরত চলে আসি।
আমি আমার জীবনে যতবারই চক্রান্তের শিকার হয়েছি, যতবারই মানুষের দ্বারা প্রতারিত হয়েছি, ততবারই আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
খুলনায় এসে আমি খুলনার অনেক বড় একটা স্কুলে, নেভি এংকরেজ ইংলিশ ভার্সন স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে চাকরি লাভ করি। এত বড় একটা স্কুলে চাকরি পাওয়া ছিল আমার জন্য একটা স্বপ্নের মত।




আমার স্কুলের জন্য আমি খুব বেশি পরিশ্রম করা শুরু করি। স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রায় সব সব কমিটিতে আমাকে মেম্বার হিসেবে রাখতো। আমি অত্যন্ত দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে সব দায়িত্ব সুসম্পন্ন করতাম। আমি আমার প্রিন্সিপালের সুনজরে পড়ে যাই। প্রিন্সিপালের অত্যন্ত প্রিয় ও আস্থাভাজন হয়ে উঠি। সেই সময় প্রিন্সিপাল আমাকে একটা বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করে। তিনি যখন স্কুলে থাকবেন না, তখন আমাকে অন্যান্য শিক্ষকরা তাদের দায়িত্বে অবহেলা করে কিনা, তা গোপনে নজরদারি করার দায়িত্ব দেয়। এতে স্কুলের অনেক উপকার হয় ঠিকই, কিন্তু এই ঘটনায় অনেক সিনিয়র শিক্ষক আমার শত্রুতে পরিণত হয়। এইরকম পরিস্থিতিতে প্রিন্সিপাল স্যার চট্টগ্রামে বদলি হয়ে যায়।

নতুন প্রিন্সিপাল আসলে সিনিয়ররা সম্মিলিতভাবে আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নতুন প্রিন্সিপালকে আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত করে এবং আমার চাকরি জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে।
আমি এরকম পরিস্থিতিতে অর্থের চেয়ে আত্মসম্মানকে বড়ো মনে করে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেই। আমিই ছিলাম নেভি এ্যাংকরেজ ইংলিশ ভার্সন স্কুলের প্রথম শিক্ষক যাকে স্কুল কর্তৃপক্ষ বড় করে ফেয়ারওয়েল দিয়েছিল।
স্কুলের চাকরি চলাকালীন সময়ে আমার শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে এক নিকট আত্মীয়র সাথে অর্থাৎ আমার স্ত্রীর আপন বোনের মেয়ের স্বামীর সাথে পার্টনারশিপে একটা কিন্ডারগার্ডেন স্কুল শুরু করেছিলাম। চাকরি ছেড়ে দিয়ে সেই স্কুলের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব গ্রহণ করি। পার্টনারশিপের এই কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শর্ত ছিল যে – মেধা আর শ্রম আমার, আর অর্থ তার। লভ্যাংশ – ফিফটি-ফিফটি।
কিন্তু সে যে একটা প্রতারক, তা আমি জানতাম না। যখন স্কুল মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল, তখন সে হঠাৎ করে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিল। বলল – ‘‘আপনি ইনভেস্ট করেন, আগামী ১০ বছরে যত লভ্যাংশ আসবে, তার পুরোটাই আপনার।’’








ওপেন মিটিং-এ সকল শিক্ষকের সামনে সে এমন ডিক্লারেশন দিল। আমি জমি বন্ধক রেখে, ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে, স্কুলে ব্যাপক ইনভেস্ট করি। স্কুলকে কিন্ডার গার্টেন থেকে জুনিয়র হাই স্কুলে পরিণত করি। আমার স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিলো খুবই উন্নত মানের। বাচ্চারা খুব আনন্দের সাথে লেখাপড়া করতো এবং খুব দ্রুত বাংলা ও ইংরেজি রিডিং গড়া শিখে যেতো। এর পরবর্তি দুই বছরের মধ্যেই আল্লাহর রহমতে লভ্যাংশ আসা শুরু হয়। আমার প্রতারক পার্টনার এবার তার রূপ দেখাতে শুরু করল। সে প্রথমে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমার স্ত্রীকে হাত করে নিল। তারপর সরাসরি আমার কাছে হিসাব চাইল। আমার স্ত্রী তার পক্ষ নেওয়ায় আমি প্রচন্ড ভেঙে পড়লাম। আমি বুঝলাম আমি অনেক বড় একটা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি। স্ত্রীকে তালাক দিয়ে, স্কুল ছেড়ে দিয়ে আমি ঢাকায় চলে গেলাম। আমার স্ত্রী আমার সন্তানদেরকে সাথে নিয়ে ঢাকায় যেয়ে আমার কাছে ক্ষমা চাইলো এবং বলল সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে এবং জীবনে এইরকম ভুল আর সে করবে না।

আমি তাকে শর্ত দেই – খুলনার সকল জমি জায়গা বিক্রি করে ঢাকায় সেটেল হতে হবে। সে তাতে রাজী হলে, স্কুলে আমার বিনিয়োগের ৩৬ লাখ টাকার হিসাব আমার পার্টনার কে লিখিত আকারে প্রদান করি। সে একটা টাকাও আমাকে ফেরত না দিলে, আমি আমার আনসার উদ্দিন রোডে অবস্থিত জমি থেকে ৪ শতাংশ জমি কম দামে বিক্রি করে, ব্যাংকের লোন শোধ করে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসি।
খুলনায় জমি বিক্রির ঘোষণা দিলে এক সরকারি কর্মকর্তা সাথে জমি বিক্রির ব্যাপারে কথা চূড়ান্ত হয়। ঠিক এই সময়ে আমার স্ত্রী বলে – তার আত্মীয় অর্থাৎ যে আমাকে স্কুলে ঠকিয়েছে, আমার সেই প্রতারক পার্টনারের কাছেই জমি বিক্রি করতে হবে। এই নিয়ে সে আমার সাথে তুমুল ঝগড়া শুরু করে এবং গভীর রাতে আমার সন্তানদেরকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে মরার জন্য সন্তানদেরকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আমি নিরুপায় হয়ে মেনে নেই। জমির দাম ৫২ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে জমি বায়না করা হয়। বাকি টাকা পরবর্তী চার মাসের মধ্যে প্রদান করে, জমি রেজিস্ট্রি করে নেবে বলে চুক্তি করা হয়। কিন্তু প্রতারক-মোনাফেক তো কখনো কথা রাখে না। চার মাসের জায়গায় প্রায় দেড় বছর হয়ে গেলো, সে জমি রেজিস্ট্রি করে নেয় না। আমিও ঢাকায় বসে সঞ্চিত টাকা ব্যয় করে খাওয়া ছাড়া অন্য কিছুই করতে পারছি না। এই পর্যায়ে আমার স্ত্রী আবার তার পক্ষে কথা শুরু করে। যেহেতু মানুষ হত্যা করা ইসলামে নিষেধ, তাই আমি স্ত্রীকে আবারো তালাক দিয়ে, মোবাইল বন্ধ করে, একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে ময়মনসিংহ চলে যাই।
এদিকে আমার পার্টনার এবং আমার স্ত্রীর বোন, আমার স্ত্রীকে যে সকল লোভ-লালসা দেখিয়েছিল, তা সব বন্ধ করে দিয়ে জমি রেজিঃ না করেই আমার জমি দখল করে নেয়। আমার স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে একেবারে পানিতে পড়ে যায়। চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটতে থাকে। এবার তার মোহ ভাঙ্গে। সে এবার তাদের প্রকৃত রূপ দেখতে পায় এবং জমি উদ্ধার করার জন্য আমাকে খুঁজতে থাকে। অবশেষে সম্পূর্ণ অলৌকিকভাবে সে আমাকে ময়মনসিংহে খুঁজে পায়। এতদিনে আমি ময়মনসিংহে একটা স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে চাকরি করা শুরু করেছি।
আমার আত্মীয় স্বজনরা সবাই এক হয়ে সন্তান এবং জমি উদ্ধারের কথা বিবেচনা করে আমার স্ত্রীকে ক্ষমা করে তাকে আবার গ্রহণ করতে বলে। আমি বললাম – তাকে কোরআন শরীফ স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করতে হবে এবং স্ট্যাম্পে লিখিত দিতে হবে যে সে আর কোনদিন আমার সাথে বেঈমানী করবে না। আমার স্ত্রী তাই করল। এরপর শুরু হলো জমি উদ্ধারের সংগ্রাম। আল্লাহপাকের বিশেষ সাহায্যে আমি জমি উদ্ধার করতে সক্ষম হই।
এই অবস্থায় নতুন কোন চাকরিতে আর প্রবেশ করতে পারি নাই। ফ্রিল্যান্সিং শিখছি উদ্দেশ্য অনলাইনে স্পোকেন ইংলিশ শেখানো এবং ফ্রিল্যান্সিং করে অর্থ উপার্জন করতে পারলে সম্পূর্ণ নিজের টাকায় একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে পারবো ইনশাল্লাহ। যারা এতক্ষন ধৈর্য ধরে আমার জীবনের উত্থান- পতনের কাহিনী পড়লেন, তাদের কাছে আমি দোয়া প্রার্থী। দোয়া করবেন, আমি যেন আল্লাহর রহমতে আমার জীবনের অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি, আমিন।

সবার জীবনেই উত্থান-পতন আছে। তবে কারোটা হয় অম্ল, আর কারোটা হয় মধুর।