আত্মহত্যা ভালো না খারাপ ?
আমি জানি তুমি আত্মহত্যার কথা ভাবছো।
সত্যি কথা বলতে কি, এই পৃথিবীটা বড়ই নিষ্ঠুর। এখানে কেউ কারো আপন না। মনের তীব্র যন্ত্রণা দূর করার ভালো কোন উপায় এখানে নেই। তুমি কার সাথে তোমার কথা শেয়ার করবে ? কে আছে তোমার দুঃখের কথা শুনে তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে ? কে তোমাকে সাহায্য করবে ? কেউ নেই! সবাই যে যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। তুমি একা। একদমই একা।
আমি জানি, তুমি হয়তো কোনো কারনে মারাত্মক ভীত হয়ে আছো। খুব ভয় পাচ্ছো। কাউকে কিছু বলতেও পারছো না। আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় তুমি এ মুহূর্তে খুঁজে পাচ্ছো না।
অথবা, হয়তো কষ্ট পেতে পেতে তোমার জীবনের উপর ঘৃণা জন্মে গেছে। জীবনকে তোমার মূল্যহীন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে তোমার জীবনের কোন মূল্যই নেই। আর এ কষ্ট কোনদিনও শেষ হবার কোন উপায়ও নেই।
সত্যি কথা বলতে কি, তোমার জায়গায় আমি থাকলে আমিও ঠিক তোমার মতই ভাবতাম। না ভেবে আমার কোনো উপায়ও ছিল না। তুমি হয়তো জানো না – এই যে আমি এখন তোমার সাথে কথা বলছি, আমিও তোমার মতো অনেকবার আত্মহত্যার কথা ভেবেছি। আমার জীবনে অনেক কষ্ট। তাই আমি ভাবলাম, আমি যেহেতু তোমাদের পর্যায়ের লোক, তাই তোমাদের নিয়ে আমার কিছু লেখা উচিত।
শোনো, তোমাকে কয়েকটা কথা বলি। আত্মহত্যা করার আগে আমার এই সংক্ষিপ্ত কয়েকটা কথা তোমার শোনা দরকার।
সর্বপ্রথম তোমাকে ভাবতে হবে – এই পৃথিবীতে সবার বেঁচে থাকার অধিকার আছে, সবারই আনন্দ-বিনোদন করে মহাসুখে দিন কাটানোর অধিকার আছে, কিন্তু তোমার নেই কেন ? তুমি কি মানুষ না ? তোমার কি আর দশ জনের মত আনন্দে দিন কাটানোর কোন অধিকার নেই ?
শোনো, তুমি মারা গেলে এই পৃথিবীর কারো কিছু আসে যায় না। মাঝখান থেকে বোকার মত তুমি কেবল পৃথিবী থেকে চলে গেলে। তুমি মানুষের কথার ভয় পাচ্ছো ? মানুষের কথাকে ভয় করোনা। ওরা একটা বললে, তুমি পাঁচটা শুনিয়ে দেবে। তোমার মুখ নাই ? তুমি তো বোবা না। তুমি যখন একটা কথার উত্তরে পাঁচটা শুনিয়ে দেবে তখন দেখবে ওরা ধীরে ধীরে বলা বন্ধ করে দিয়েছে। তোমার পৃথিবীতে বেঁচে থাকা খুব দরকার। তোমার নিজের জন্য না হলেও তোমার পিতা-মাতার জন্য, তোমার ভাই-বোনদের জন্য, তোমার সন্তানদের জন্য, তোমার প্রিয় মানুষদের জন্য, সমাজের নির্যাতিত অসহায় মানুষদের জন্য তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে।
শোনো, নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। তুমি কখনোই তোমার অধিকার ছাড়বে না। যদি একদমই সহ্য করতে না পারো, বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। নিরুদ্দেশ হয়ে যাও। যেন কেউ তোমাকে খুঁজে না পায়। সেখানে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করো, তবু আত্মহত্যা করো না। বিশ্বাস করো, তোমার মৃত্যু হলে তোমার শত্রুরা, যারা তোমার ভালো চায় না, তারা সমস্ত লোকের সামনে তোমাকে গালি দেবে, তোমাকে মিথ্যা অপবাদ দেবে, তোমার নিষ্কলুস চরিত্রের উপর কলঙ্ক লেপন করবে, সমাজে তোমাকে খারাপ মানুষ হিসেবে প্রতিপন্ন করবে। জানো তো, মৃত ব্যক্তি কথা বলতে পারে না। কিন্তু তুমি বেঁচে থাকলে ওরা কখনোই এটা করতে সাহস পেতো না।
তোমার আজকের এই অবস্থার জন্য যে বা যারা দায়ী তাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দেবার জন্য হলেও তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। চিরদিন কারো এক রকম যায় না। একটু ধৈর্য ধরো। দিন তোমারও আসবে। আজকে যারা তোমাকে আঘাত করেছে, তোমার যখন দিন আসবে এর থেকে শতগুণ নির্মম নিষ্ঠুর আঘাত করে তুমি তাদেরকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেবে। মনে রাখবে, এই পৃথিবী থেকে অসময় চলে যাবার জন্য তুমি পৃথিবীতে আসোনি। যারা আজকে তোমার এই অবস্থার জন্য দায়ী তাদেরকে শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত তুমি মরতে পারো না।
প্রিয় বন্ধু আমার ! তুমি জানো না, তোমার মূল্য কতো ! তোমার মত সৎ আর ভালো মানুষের এই পৃথিবীতে বড় অভাব। তুমি বেঁচে থাকলে জীবনে তুমি বহু অসহায় লোকের উপকার করতে পারবে, তুমি মোরে গেলে এদের উপকার কে করবে বলো ?
বন্ধু, তুমি কি একা থাকো ? যদি তুমি একা থাকো, তাহলে নিকটতম কোন বস্তিতে যাও। তাদের দুঃখের কথা শোনো, তাদেরকে নানাভাবে সাহায্য করো, তাদের সাথে সময় কাটাও, তাদের সাথে হাসি-ঠাট্টায় মেতে ওঠো – দেখবে তোমার মন থেকে আত্মহত্যার চিন্তা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।
একটা কথা মনে রেখো – যে সহে, সে রহে। যে ধৈর্য ধরতে পারে, সেই পৃথিবীতে টিকে থাকে। তাই যে অবস্থায়ই থাকো না কেন, সেই অবস্থাকে মন থেকে মেনে নাও।
সোজা হয়ে দাঁড়াও। জোরে বুক ভরে শ্বাস নাও। ধীরে ধীরে ছাড়ো। এভাবে কয়েকবার করো। তারপর নিজেকে বলো – ‘‘আমি মেনে নিলাম, আর আমি ধৈর্য ধরবো যতক্ষণ না অবস্থার পরিবর্তন হয়’’। দেখবে – ওই অবস্থাতেই তোমার মন আনন্দে ভরে উঠছে।
বন্ধু, পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এই সুন্দর পৃথিবী থেকে কেনো তুমি অসময়ে চলে যাবে ? এই পৃথিবীর সম্পূর্ণ রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করার পূর্ণ অধিকার তোমার আছে।
প্রিয় বন্ধু আমার! প্রত্যেকের মনের ভিতর একটা নেগেটিভ পার্ট আছে। এটা অনেকেই জানে না। মনের এই অংশটা সব কিছুর মধ্যে খারাপ কিছু খোঁজার চেষ্টা করে। সব সময় মনকে নিরাশার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। তোমাকে কঠোর হস্তে মনের এই অংশটাকে দমন করতে হবে। এ তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু। এটা তোমাকে প্রতি মুহূর্তে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
একে দমন করতে হলে তোমাকে রুমে দরজা দিয়ে একা থাকতে হবে। তারপর শব্দ করে নিজেই নিজেকে বলবে – ‘‘হে মন, তুমি শুনে রাখো- আমি তোমার কথা মতো আর চলবো না। আমি এখন থেকে আনন্দ করবো, সবার সাথে মিশবো, সারাক্ষণ আনন্দের মধ্যে থাকবো, তোমার কথা মতো আর কখনো হতাশ হবো না।’’
বন্ধু, চিন্তা করে দেখো- তুমি মোরে গেলে তোমার বাচ্চাদের কি হবে ? এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর শয়তানগুলো ওদেরকে ছিঁড়ে খাবে। তুমি ছাড়া ওদেরকে কে রক্ষা করবে বলো ? নিজের জন্য না, ওদের জন্য হলেও তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে।
বন্ধু, এতো কথা শোনার পর আমার মনে হয়, আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত থেকে তোমার সরে আসা উচিত। তুমি জীবনে সুখী হও এই আমি চাই। এই পৃথিবীতে মানুষ আসে নিজেকে আর অন্যদেরকে সুখী করতে। অকালে পৃথিবী থেকে চলে যাবার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেননি।
যাই হোক, তোমার অনেকটা সময় নষ্ট করার জন্য আমাকে ক্ষমা করো। আমার কথায় যদি তোমার সামান্যতম উপকার হয়ে থাকে, তবে আমার জন্য দোয়া কোরো। তোমার জীবন আনন্দে ভরে উঠুক এই কামনা করে শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ।
লেখক – এস এম হাবিবুর রহমান
মোবাইল : +৮৮০১৩১২ ৫১২ ০১২
